আলোর প্রদীপ জ্বালানো এক শিক্ষাগুরুর প্রয়ান

সম্পাদকীয়

কিছু কিছু মানুষের মৃত্যু সমাজে শূন্যতা সৃষ্টি করে সমাজ হারিয়ে ফেলে অভিভাবক, সঠিক চলার পথের দিশারী।
আদর্শ সমাজ গঠনের কারিগর একজন প্রতিভাবান আদর্শ শিক্ষক। এমনই একজন আদর্শ শিক্ষককে আমরা হারিয়েছি। নকিপুর সরকারি হরিচরণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ২৪ বছরের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকারী সাবেক প্রধান শিক্ষক আলহাজ্ব গিয়াসউদ্দিন আহমেদ আমাদের মত হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে রেখে চিরদিনের মত বিদায় নিয়েছেন। তার মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত।
আমার আব্বাকে হারিয়েছি ইংরেজী ২০০৯ সালে। তিনিও একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। আমার আব্বা আলহাজ্ব মাওলা বখ্শ ও সদ্য প্রায়ত গিয়াস উদ্দিন স্যার একসাথে নুরনগর আশালতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। পরবর্তীতে আমার আব্বা নকিপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও গিয়াস উদ্দিন স্যার নকিপুর হরিচরণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে চলে আসেন। আব্বার কলিগ হওয়ার কারণে আমাদের দুই পরিবারের সাথে ছিল নিবিড় সম্পর্ক। নুরনগর স্কুলে আমার বড় দুই বোন সুফিয়া ও রিজিয়া এবং নকিপুরে আমার ভাই ডাঃ আনোয়ার ও আমি গিয়াস উদ্দিন স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম।
সে সময়ে শ্যামনগরে বিজ্ঞান শিক্ষকের বড়ই অভাব ছিল। সদ্য ঢাকা কলেজ থেকে বিজ্ঞানে সফলতার সাথে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে সরকারি কোন চাকরিতে যোগদান না করে মাটির টানে গ্রামে ফিরে আসা এই মানুষটি কোমর বেঁধে শিক্ষাকতার মহান ব্রত নিয়ে মাঠে নেমে পড়লেন। গ্রামের ধুলাবালি ও কাদামাখা ছেলেমেয়ে গুলোকে পরম আদরে গড়ে তুললেন হীরের টুকরায়। নুরনগর ও নকিপুর এই দুটি শিক্ষাঙ্গন থেকে সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস অফিসার ও অন্যান্য পেশাজীবী।
আমি ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত নকিপুর হরিচরণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির পরপরই বাবার কলিগ গিয়াস স্যারের সান্নিধ্য লাভ করি। আমার দিকে সব সময় আলাদা একটা নজর থাকতো শ্রদ্ধেয় স্যারের। দীর্ঘ পাঁচটি বছর স্যার আমাকে এক রকম বুকে আগলে রেখেছিলেন।
একজন জাত শিক্ষকের ভিতরে যেসব গুনাবলী থাকা প্রয়োজন তার সবকিছুই ছিল স্যারের মধ্যে। তিনি বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্য তার মুনশিয়ানা ছিল সমানতালে। স্যারের অসাধারণ বাচনভঙ্গী ও শিক্ষাদানের কৌশল আমাদের মুগ্ধ করত। মাধ্যমিক জীবনে প্রতিভাবান ছাত্র হিসেবে যে পরিচিতি লাভ করেছিলাম পরবর্তীতে নিজের উদাসীনতায় গতি নষ্ট হওয়ার কারণে স্যার ভীষণ আশাহত হয়েছিলেন।
২০০২ সালে অবসর গ্রহণের পরেও স্যার শিক্ষকতার ব্রত নিয়ে আরো কিছু প্রতিষ্ঠানে অবৈতনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছিলেন। সব সময় তার প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের খোঁজখবর নিতেন। তাদের সফলতায় তিনি যেমন খুশি হয়েছেন ব্যর্থতায় কষ্টও পেয়েছেন। এভাবেই চলছিল স্যারের অবসরের জীবন।
করনা ভাইরাস দুর্যোগকালীন এই সময়টাতে স্যার কিছু দিন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। অবশেষে ১৯ জুলাই তিনি আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন। আমরা হারালাম একজন অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও আলোর দিশারীকে।
মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে প্রার্থনা করি তিনি যেন শ্রদ্ধেয় স্যারকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।