ছবি : ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুস্থতার সংজ্ঞা দিয়েছে—‘Health is a state of complete physical, mental and social well-being and not merely the absence of disease or infirmity.’ অর্থাৎ রোগবালাইমুক্ত হলেই শুধু নয়, শারীরিক বা দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক সবলতাই সুস্থতা। এর সঙ্গে আর্থিক সক্ষমতা যোগ করলে কেমন হয়? কেননা আর্থিক সামর্থ্যও তো  সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। আর্থিক অসচ্ছলতা, দারিদ্র্য-দৈন্যের দুশ্চিন্তা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সবলতা অর্জনের পথে পয়লা নম্বরের প্রতিবন্ধকতা। এটা একজন ব্যক্তি বা ব্যষ্টির জন্য যেমন সত্য, ব্যষ্টির সমষ্টি পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির জন্যও প্রযোজ্য। একবিংশ শতাব্দীতে এ পর্যন্ত বৃহৎ বলে বিবেচিত নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক বিচরণ যেভাবে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে, তাতে পৃথিবীর সব নাগরিক ব্যক্তিগত শারীরিক সুস্থতা, মানসিক শান্তি ও সামাজিক সুরক্ষা সংকটের সম্মুখীন। আর এজন্য বর্তমান কিংবা আসন্ন অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ। উচ্চবিত্ত বাদে মধ্যবিত্তসহ অন্য সবাই (৯৬ শতাংশের বেশি মানুষ) স্বাভাবিক জীবনযাপন ও ধারণে প্রাণান্ত সংগ্রামে লিপ্ত। এ পরিস্থিতিতে মহামারী করোনা মোকাবেলায় উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় ঠাসা বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত এবং সমন্বয়হীন কর্মসূচি পালনের নামে সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হতে হলে গতস্য শোচনা ও সমালোচনা নাস্তি, টিকে থাকার জন্য নির্দেশনামতো যথা প্রস্তুতিসহকারে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই কর্তব্য।

শারীরিক সুস্থতা

কর্তব্য করোনা প্রতিরোধ এবং নিরাময়ভাইরাস হিসেবে করোনা মানুষের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে, মানবদেহে সংক্রমিত হয়ে প্রথমে লুকিয়ে থাকে এবং এক পর্যায়ে সক্রিয় হয়ে ফুসফুসে আক্রমণ করে শারীরিক ক্ষতিসাধন করে। সচরাচর অন্যান্য ভাইরাসের চেয়ে মানবদেহে করোনার সরাসরি সংক্রমণের ক্ষমতা চাতুর্যময় ও ব্যাপক বলেই এবং এখন পর্যন্ত একে নিরাময়ের কোনো প্রতিষেধক নেই বলেই করোনাকে ভয়াবহতম ভাইরাস ভাবা হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে মানুষের অভিবাসন স্বল্প সময়ে দ্রুততর সম্ভব হওয়ায় এবং করোনা সংক্রমণ ও সংহারের সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ অবারিত থাকায় অতীতের মহামারীগুলোর তুলনায় করোনার প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী ধর্ম-বর্ণ, অর্থ-দর্শন  নির্বিশেষে সব মানুষকে মারাত্মক উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় ফেলে দিয়েছে। অতীতের মতো বর্তমানেও মানুষ শারীরিক ক্ষয়ক্ষতিকারক জানা-অজানা বহু সংক্রামক-অসংক্রামক ও দুরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে চললেও করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিরাময় নিয়ন্ত্রণে গোটা বিশ্ব আজ বেশ হিমশিম খাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে করোনার বিস্তার বা সংক্রমণ প্রতিরোধকে তাই এ মুহূর্তের অন্যতম করণীয় কৌশল হিসেবে সব প্রয়াস-প্রচেষ্টার ওপর স্থান দিতে হবে। সবাইকে সচেতনভাবে, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রতিরোধমূলক যা যা উপায় অবলম্বন করা দরকার, তাতে শামিল করতে পারলেই করোনার ব্যাপক বিস্তার রোধ ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো বা থামানো যাবে। করোনা সংক্রমণ ঠেকানোর সংগ্রামে ব্যর্থতা মানে মানবিক বিপর্যয়; যেমন ঘটেছে চীন, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে। এরা সবাই উন্নত বিশ্ব, সংক্রমণ ঠেকানোর সক্ষমতা সরঞ্জাম, অর্থ তাদের আছে, তা সত্ত্বেও। দেশে প্রত্যাবর্তনকারী অধিকাংশ কর্মজীবী প্রবাসী প্রযোজ্য কোয়ারেন্টিন পরিপালন ছাড়া সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই ‘সামাজিক দূরত্ব’ সৃষ্টির মতো কর্মসূচিতে  বেগ পোহাতে হচ্ছে, পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় আক্রান্ত চিহ্নিতকরণে পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অপ্রতুলতায় সংক্রামকদের শনাক্তকরণে বিলম্ব ঘটেছে। নির্ঘাত সংক্রমণের সম্ভাবনায় রোগীর সংস্পর্শে আসা তো দূরের কথা, তার থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান আবশ্যক ছিল। যে কারণে রোগীকে আইসোলেশনে রাখার প্রয়োজনও ছিল। ব্যর্থতায় এর  বিপরীতে  রোগীর চিকিৎসা সেবা-শুশ্রূষা ও সহানুভূতি পাওয়ার এমনকি মৃত্যুর পর সমাহিত হওয়ার সর্বজনীন অধিকারবঞ্চিত হওয়ার ভয় তৈরি হওয়ায় করোনায়   আক্রান্ত হওয়ার পরীক্ষা করায় অনীহা, রোগীর তথ্য প্রকাশ না করার প্রবণতা বেড়েছে। এমনকি পরিবারের পক্ষ থেকে আপনজনের মৃত্যুর তথ্যটি পর্যন্ত গোপন রাখার চেষ্টা চলেছে। এ সবই প্রকারান্তরে অত্যন্ত ছোঁয়াচে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণেরই বিস্তার ঘটার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সংক্রমিত রোগী শনাক্তকরণ পদ্ধতিকে ব্যাপক, গণমুখী ও সহজসাধ্য করা, সম্ভাব্য সংক্রমণকারীদের কঠোর কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন এবং সব শেষে আক্রান্তকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসাসেবাদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে উপরোক্ত ঝুঁকি এড়ানো কিংবা মোকাবেলা সহজ ও সম্ভব হতো। তাছাড়া সবচেয়ে যেটা প্রয়োজন ছিল, যথাসময়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তাসামগ্রী নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে যেকোনো ব্যর্থতা বা বিলম্ব হলে করোনা মোকাবেলা আরো নাজুক হতে পারে। সমস্যা সৃষ্টি হতে দিয়ে সমাধানের চেষ্টা শুরু করা হলে ফলাফল দুঃখজনক হয়েই থাকে। এটা যেন না হয়, সেটাই সবার প্রত্যাশা ও প্রার্থনা। সুতরাং অবিলম্বে সংক্রমণ শনাক্তকরণ (টেস্ট, টেস্ট, টেস্ট) এবং আক্রান্তদের পরিবারের প্রযত্নে না রেখে সর্বজনীন বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনায় আনা অতীব জরুরি। এখনই।

কেউ করোনায় আক্রান্ত কিনা, সেটা সবাই নিজে উপসর্গ যাচাইয়ের মাধ্যমে করতে পারেন, এটি একটি অতি সাময়িক ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানসম্মত না হলেও আমাদের মতো পরিস্থিতিতে বিশেষ উপযোগী প্রতীয়মান হয়—

দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সের প্যাথলজি বিভাগ বায়ুদূষণজনিত, সাধারণ ঠাণ্ডা, ফ্লু ও করোনার লক্ষণ শনাক্তে উপসর্গ শ্রেণীবিন্যাস করেছে এভাবে—(১) শুকনা কাশি+হাঁচি = বায়ুদূষণের লক্ষণ; (২) কাশি+গলাব্যথা+হাঁচি+নাক দিয়ে পানি আসা = সাধারণ ঠাণ্ডা; (৩) কাশি+গলাব্যথা+হাঁচি+নাক দিয়ে পানি আসা+শরীরব্যথা+শারীরিক দুর্বলত বোধ+ হালকা জ্বর = ফ্লু; (৪) শুকনা কাশি+হাঁচি+শরীরব্যথা+গলাব্যথা+দুর্বলতা বোধ+বেশি জ্বর+শ্বাসকষ্ট = করোনাভাইরাস। জাপান ও অধিকাংশ দেশের চিকিৎসকদের মতে, যদি কেউ সকালে উন্মুক্ত বাতাসে লম্বা দম নিয়ে ১০ সেকেন্ড তা ধরে রাখার সময় বুকে ব্যথা অনুভব না করেন বা কাশি না আসে তাহলে ধরে নেয়া যায় তিনি নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন।

কর্তব্য সর্বজনীন চিকিৎসা সচল রাখা এবং চিকিৎসাকর্মীদের দায়িত্ববোধ: করোনার ভয়ে, ধমকে, করোনা মোকাবেলার নামে, অজুহাতে সচরাচর অন্যান্য রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা বা সেবা বন্ধ বা সীমিত হওয়ার উপক্রম এ মুহূর্তে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনার ভয়ে অন্যান্য ব্যাধির চিকিৎসাসেবা থেকে কেন বঞ্চিত হবে সবাই, কেন সাধারণ হাসপাতালের চিকিৎসক-চিকিৎসাকর্মী দায়িত্বপালনের পরিবর্তে সরকার ঘোষিত ছুটিতে থাকতে, ক্লিনিক বন্ধ রাখতে, বিরত থাকতে বাধ্য হবেন। প্রয়োজনের সময় চিকিৎসাসেবায় ঝাঁপিয়ে পড়ার ব্রতই তো ১৯৪৮ সালের (২০১৭ সাল পর্যন্ত ন্যূনতম নয়বার সংশোধিত, পরিমার্জিত) জেনেভা ঘোষণা, যা জপে সবাই এই মহৎ, ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘মানবসেবা’ধর্মী পেশা শুরু করেন। এটা অনস্বীকার্য যে করোনায় সংক্রমণ থেকে চিকিৎসাকর্মীদের সুরক্ষাসামগ্রীসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে সবার স্বার্থেই। দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে জাতীয় বীরের দায়িত্ব ও ভূমিকা পালনে সুযোগ গ্রহণে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে এগিয়ে আসতে হবে। যারা অক্লান্ত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি অভিবাদন ও কৃতজ্ঞতা।

কর্তব্য করোনা পথ চিনে গেল যে!: আকিঞ্চন আকাঙ্ক্ষা এই যে সামনের কয়েক মাসের মধ্যে করোনার প্রকোপ প্রশমিত হবে। তার কিছুদিন পর করোনার কথা মাঝেমধ্যে হয়তো মনে পড়বে। কিন্তু এ কথা ভুলে বসে থাকলে চলবে না যে করোনা আবার আসবে, সে পথ চিনে গেছে। আগামী কোনো শীতে কিংবা কোনো মৌসুমে সে সহসা দেখা দেবে। এবারের চরম অভিজ্ঞতার আলোকে তাকে মোকাবেলার প্রস্তুতি আগে থেকে নিয়ে রাখতে হবে। ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও তার সফল প্রয়োগ পরীক্ষার প্রদোষকাল পেরোতে হবে। কলেরা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া মাঝে মাঝে চোখ রাঙিয়ে আসে। ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯-এ বাংলাদেশে ডেঙ্গু অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করার দুঃসাহস দেখাতে পেরেছিল। সামনে সে যেন ভালো স্কোরের আশাবাদী। তাকে ভালোভাবে রোখার জন্য যে সময় এরই মধ্যে পাওয়া গেছে, তার সদ্ব্যবহার হয়েছে কি? ২০১১ সালে অসংক্রামক রোগ রোখার জন্য ঘটা করে যে শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল জাতিসংঘ, সেখানে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা সাফল্যের জয়গান গাওয়া হয়েছিল। শীর্ষ সম্মেলনে অসংক্রামক ব্যাধিনিচয়ের প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য অনুরূপ উত্তম কর্মপন্থা গ্রহণের জন্য স্ব-স্ব দেশ বা সরকারপ্রধানরা প্রতিজ্ঞাপত্রে (এ/৬৬/এল ১) স্বাক্ষর করেছিলেন।  হায় ২০২০ সালে এসেও দেখা যাচ্ছে সংক্রামক-অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধের তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি অধিকাংশ দেশে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি থেকে প্রতিরোধ নীতিমালার খসড়া তৈরি করে দাখিল করা অবস্থায় বছরের পর বছর পড়েছিল। আজ সেই নীতিমালার আলোকে যদি কিছু অবকাঠামো গড়ে উঠত, জনসচেতনতা ও লজিস্টিক তৈরি হয়ে থাকত, কার কী দায়িত্ব ঠিক হয়ে থাকত, তাহলে করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশকে এমন কাহিল অবস্থায় পড়তে হতো না।

মানসিক সুস্থতা

কর্তব্য মানসিক শান্তি  শক্তিদেশে-বিদেশে করোনা  নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও ক্ষয়ক্ষতির বেহাল   চিত্র দেখে আস্থাহীনতায় আতঙ্ক, আশঙ্কা বেড়েই চলেছে; যা মানসিক অশান্তির উপসর্গ। অথচ মানসিক শান্তি বা মনের বল করোনার মতো ভয়াবহ মহামারী মোকাবেলায় প্রাণশক্তি হতে পারে। বাংলাদেশে যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও তত্পরতায় (যা মাননীয় উচ্চ আদালতও ৫ মার্চ সরকারকে জানাতে তাগিদ দিয়েছিলেন) বিলম্ব, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান হয়ে উঠলে আস্থাহীন অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আর এমন আস্থাহীন পরিবেশই সাধারণত তথাকথিত গুজব, উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা সৃষ্টির দ্যোতক হিসেবে কাজ করে। শুধু আহ্বান জানিয়ে ও শাস্তির ভয় দেখিয়ে গুজব রটনা ও গুজবে কান দেয়া বন্ধ হওয়ার প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার নয়; আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে, কঠিন বাস্তবতায় করোনা মোকাবেলায় গৃহীত ব্যবস্থার স্বচ্ছতায় ও আন্তরিকতায় সবাইকে শামিল করতে পারলে গুজব লাপাত্তা হবে। কাণ্ডারিকে হুঁশিয়ার করে দিতে নজরুলের ছিল সেই আহ্বান, ‘ওরা হিন্দু না মুসলিম? এই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’ গৃহীত সব পদক্ষেপে বিচ্যুতির পরিবর্তে সবাইকে অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে আস্থা ও জাতীয় ঐক্য গড়া প্রয়োজন। ঐকমত্যের ঐশ্বর্য মতানৈক্যের মাশুল দিতে দিতে যেন শেষ না হয়।

কর্তব্য আত্মিক  আধ্যাত্মিক শক্তির প্রেরণাচিন্তা থেকে কাজের উত্পত্তি। চিন্তা বা নিয়ত বা কর্মপরিকল্পনা পল্লবিত হয় আত্মায়। পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে এ আত্মার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ঠিক থাকা জরুরি। কেননা ভালো-মন্দ, ভূত-ভবিষ্যৎ জ্ঞান পরমাত্মার এখতিয়ার। যুদ্ধের সময় অগ্রবর্তী দলে সেনাবাহিনী যেমন সবসময় হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে নির্দেশনা মতো কাজ করে, হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে রসদ প্রাপ্তিতে বিঘ্ন ঘটে, শত্রুর অবস্থানের নিশানা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে দিশেহারা হয়ে শত্রুর কব্জায় চলে যেতে পারে ওই বাহিনী। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, তার জীবনসংগ্রামে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকেই সে পাবে প্রেরণা, বিপদতারণের মদদ; বিপদে সৃষ্টিকর্তার কাছে জানাবে ফরিয়াদ, চাইবে মার্জনা। এটাই তার মনের শক্তি ও সান্ত্বনা অর্জনের পথ। করোনা মহামারী প্রকৃতির প্রতিশোধ, নানা সীমা লঙ্ঘনের অভিঘাত, প্রতিফল। সুতরাং এ থেকে নিষ্কৃতিলাভের শ্রেষ্ঠ উপায় অনুতপ্ত, অনুশোচনার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তা পাওয়াই তার মানসিক শান্তি ও শক্তি। চীন থেকে ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, স্পেন, সিঙ্গাপুর, ইরান, সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য—সর্বত্র যার যার ধর্ম বিশ্বাসমতো সৃষ্টিকর্তার প্রতি আবেদন-নিবেদনে নত করোনাক্লিষ্ট রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান থেকে সবাই।

বিধাতার প্রতি নৈবেদ্য, তার স্মরণ সব সমাজে অনবদ্য সাধনার বিষয়। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে মানুষে মানুষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের ব্যাপক ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে বিধাতার কাছে নৈবেদ্য নিবেদনের কাব্য গীতাঞ্জলির গান বা কবিতাগুলোর জন্য। স স্টার অসীম ক্ষমতার উপলব্ধি এবং তারই কাছে এর পরিত্রাণ প্রার্থনাই আজকের সংকট মোকাবেলার জন্য অপরিহার্য।

সামাজিক বন্ধন

কর্তব্য সামাজিক সংহতিপ্রাচীনকাল থেকেই দেশ-কাল-পাত্রভেদে মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করতে সবার ভালোর জন্য জোরেশোরেই চলছে ‘সামাজিক দূরত্ব’ তৈরির কর্মসূচি। এটিকে ছোঁয়াচে রোগ করোনার বিস্তৃতি প্রতিরোধের মোক্ষম উপায় ভাবা হচ্ছে। অথচ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী মহামারী নিয়ন্ত্রণে, মানুষকে উদ্ধারে সামাজিক সংহতির ভূমিকাই অগ্রগণ্য। ১৮৪৪ সালে কুষ্ঠ রোগীদের পরিবার ও সমাজবিচ্ছিন্ন করে দ্বীপান্তরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কানাডার পূর্ব উপকূলীয় রাষ্ট্র নিউ ব্রান্সউইক। ইতিহাসের পাতায় রয়েছে দারুণ অমানবিক অনুরূপ অনেক ঘটনা। করোনা বিশ্বমানবতাকে সে রকম এক সংকটের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

কর্তব্য সহানুভূতি সমানুভূতির সুরক্ষাচীনের মতো একটি ‘নিয়ন্ত্রিত সমাজ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী-ভোগবাদী উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক অ্যাডাইসিভ মিশ্রিত রাজনীতির রসে ভরা স্থূল (অবিস) সমাজ ও পেট মোটা অর্থনীতিতে কিংবা ইতালি, স্পেন, ফ্রান্সের মতো তথাকথিত ওয়েলফেয়ার সমাজে পানপ্রিয় জাতির কাছে সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি একই আবেদন বা অবদান রাখতে পারে না। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতিতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি ও সামাজিক বন্ধনরীতি যেখানে সুদৃঢ়। করোনা মোকাবেলায় আক্রান্তের সেবা-শুশ্রূষায় চিকিৎসাকর্মীর সমানুভূতি, পারিবারিক নৈকট্য, সামাজিক সহানুভূতি যেখানে বিশেষ টনিক হিসেবে কাজ করবে। গোটা পরিবার এমনকি পাড়া-প্রতিবেশীকে নির্বাসনে (কোয়ারেন্টিন) নিয়ে সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য রোগীকে একঘরে (আইসোলেশন) করার সামাজিক ভয় না ঢুকিয়ে বরং সবাইকে প্রত্যেকে আমরা পরের তরে এ ধরনের উপলব্ধিজাত সহানুভূতি-সমাদরের হেতুতে পরিণত করাই তাহলে স্টিগমা কেটে যাবে, কর্মসূচিটি আমাদের সমাজের জন্য টেকসই হবে। শ্রমজীবী প্রবাসীরা দেশের জন্য রেমিট্যান্স আনেন, তারা দেশের সম্পদ বিদেশে নিয়ে যান না, তারাই বরং বিদেশের সম্পদ দেশের জন্য আনেন অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করে। করোনার ক্রান্তিকালে কর্মহীন হয়ে করোনার হাত থেকে বাঁচার তাগিদে মৌলিক অধিকারে তারা দেশে স্বজনের কাছে ফিরেছেন, কিন্তু দেশে পৌঁছিয়েই তাদেরকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে রাখার সময় স্বাগত সান্ত্বনা তো দূরের কথা, তাদের পর্যাপ্ত ও প্রযোজ্য প্রযত্ন তারা পাননি। যেটা করা হলে তারা কোয়ারেন্টিন এড়িয়ে সবার মাঝে মিশে যেতে পারতেন না। ‘অপরাধী’ সাব্যস্ত হয়ে জরিমানা গুনতে হতো না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নামে এখনো বিদেশ থেকে আসাদের খুঁজে বেড়ানো হচ্ছে, বাসাবাড়িতে লাল পতাকা টানিয়ে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। অবস্থা এমন যে এটা যেন তাদের দেশে ফিরে আসার প্রায়শ্চিত্ত। অথচ করোনায় সংক্রমিত হওয়ার সন্দেহে এবং প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তাকে কার্যকর করতে প্রবাসীদের জন্য সরকারি খরচে আলাদা থাকা-খাওয়া ও ‘একঘরে’ হয়ে অবস্থানের ব্যবস্থা করলে সেটি মানবিক ও সামাজিকভাবে যৌক্তিক হতো। চীন চটজলদি হাজার হাজার বেডের হাসপাতাল তৈরি করেছিল করোনা প্রতিরোধের জন্য। বাংলাদেশে প্রবাসীরাই সংক্রমণের উৎস টার্গেট গ্রুপ ছিল, করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রধান বিনিয়োগ তাদের জন্য শুরু হওয়া উচিত ছিল।

করোনায় মৃত্যু হয়েছে কিনা, মারা যাওয়ার পর তার পরীক্ষা করা এবং তার ভিত্তিতে তার পরিবার এমনকি গ্রামকে লকডাউন করা, তার স্বাভাবিক জানাজা ও দাফন-কাফন নিয়ে বিতর্ক-বিসংবাদ তৈরি হওয়ার স্টিগমা তৈরি হওয়া বাঞ্ছনীয় নয় কোনোমতেই। চার-পাঁচ দশক আগেও গ্রামবাংলায় কলেরা বা ওলাওঠায় গ্রামকে গ্রামের মানুষ উজাড় হয়ে যেত, ভয়ে মৃতদের সত্কারের লোক পাওয়া যেত না। এ রকম পরিস্থিতিতে গণমৃতদের দাফন-কাফন, জানাজা, তাদের দোয়া অনুষ্ঠানের জন্য খান বাহাদুর আহছানউল্লা নিজ গ্রামে যুবসমাজকে সংগঠিত করে নবীজির (দ.) হিলফুল ফজলের প্রেরণায় একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। মুষ্টির চাল ভিক্ষা করে খরচপাতি সংগ্রহ করে অসহায় মানুষের সামাজিক আনুষ্ঠানিকতাগুলো পরিপালনের উপায় সৃষ্টি করেন। ১৯৩৫ সালে সাতক্ষীরার নলতায় গড়ে ওঠা সেই অতিসামান্য সংগঠন আজ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান আহছানিয়া মিশন। রামকৃষ্ণ মিশনও অনুরূপ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আগরতলার হাবলু মিয়ার লিচু বাগানে ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন আজকের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ প্রমুখরা, যুদ্ধবিধ্বস্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবিগঞ্জের বুড়িচঙ্গে ফজলে হাসান আবেদের ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকেই আজ বিশ্বের সেরা এনজিও ব্র্যাক। এসবই সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রেরণা থেকে। সমাজের মধ্য থেকেই সামাজিক সেবার আগ্রহ বেরিয়ে আসবে যদি তা দ্রুত কর্তৃপক্ষীয় প্রযত্ন ও পদ্ধতিগত সহায়তা পায়।

অর্থনৈতিক  স্বনির্ভরতা

কর্তব্য মানবসম্পদ বাঁচাতে তাত্ক্ষণিক সহায়তা

একথা না মেনে উপায় নেই যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মানুষ শারীরিকভাবে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে, তার চেয়ে করোনাকালে কর্ম ও আয় উপার্জনহীন হয়ে, অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে আর্থিক সংকটে তার শতসহস্র গুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যক্তি ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য করোনা তাই বড় হুমকি। মানবসম্পদ বাঁচানোর জন্য করোনার প্রাদুর্ভাবের ভয়ে, করোনা প্রতিরোধের উপায় হিসেবে ছুটি, গৃহে অন্তরীণ হওয়ায় আয়-উপার্জনহীন হয়ে পড়া দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষ, স্বল্প বেতনভুক্ত মানুষ, নিঃস্ব সহায়-সম্বলহীন মানুষ সবাইকে দৈনন্দিন খোরাকি পৌঁছাতে হবে; অব্যাহত রাখতে হবে যত দিন তারা স্বাভাবিক অর্থাত্ গত ফেব্রুয়ারির কর্মচঞ্চল আয়-উপার্জনের অবস্থায় ফিরে না আসে। সবাইকে প্রযোজন মতো খোরাকি নিয়মিত পৌঁছানোর ব্যবস্থাপনা হতে হবে নিশ্ছিদ্র ও দুর্নীতিমুক্ত। প্রথম দিকে উত্সাহী সহায়তাকারীদের বিক্ষিপ্তভাবে খাদ্য ও নগদ অর্থ বিতরণে আগ্রহ দেখা যাবে, ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংস্থার পক্ষ থেকে খাদ্যসহায়তা বিতরণের উদ্যোগ থাকবে কিন্তু এ তত্পরতাকে নিয়মিত ও টেকসই করতে খোরাকি ভাতা বা সামগ্রী বিতরণের কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতে ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। আপত্কালীন সময়ে তাদের দেখার দায়িত্ব আসবে। প্রান্তিক মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সংকট কতদিন স্থায়ী হবে জানা না থাকায় আগামী ছয় মাস কিংবা এক বছরের পরিকল্পনা নিয়ে সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে।

  1. মধ্যবিত্ত, যারা হাত পাততে পারবে না অথচ তাদের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে, তাদের জন্যও সমন্বয়ধর্মী পদক্ষেপ নিতে হবে।
  2. কঠোর কৃচ্ছ্র অবলম্বনের বিকল্প নেই। করোনা জাতীয় অর্থনীতিতে এতদিনের অর্জিত সাফল্য ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির অগ্রযাত্রাকে শুধু শ্লথ করবে না, ক্ষেত্রবিশেষে পিছিয়ে দেবে এবং গোটা অর্থনীতিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে ছাড়বে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে অন্তত আগের অবস্থায় (ডিসেম্বর ২০১৯) ফিরতে সরকারি-বেসরকারি, ব্যক্তি ও সামষ্টিক খাতে সর্বত্র উন্নয়ন-অনুন্নয়ন বাজেটে ব্যয়সাশ্রয়ী হতে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিতে হবে এখন থেকেই। সব প্রকার অপ্রয়োজনীয়, অনুত্পাদনশীল খাতে সময়, সামর্থ্য, সমর্থন ও অর্থের অপচয়-অপব্যয় পরিহার করা আবশ্যক হবে। করোনা বিশ্বব্যাপী তার আক্রমণের দ্বারা বড়-ছোট সব অর্থনীতিকে কুপোকাত করে এ সত্য জানান দিয়ে যাচ্ছে যে এখন থেকে যার যা আছে তা-ই দিয়ে তাকে চলতে হবে। পরমুখাপেক্ষী কিংবা পরনির্ভরশীল হওয়া বা থাকার সুযোগ হবে সীমিত। সুতরাং স্বনির্ভর আর্থিক স্বয়ম্ভরতা অর্জনের পথে আরো বেশি ‘হিসাবি’, আরো বেশি ‘সতর্ক’ ও সাবধানতা অবলম্বনকে জাতীয় চিন্তাভাবনা ও অভ্যাসের আওতায় আনতে হবে।

কর্তব্য স্বল্প  মধ্যমেয়াদি

  1. অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা রাখতে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে

স্বাস্থ্য ও জীবিকা পরস্পরের হাত ধরে চলে। তাই করোনা মহামারী থেকে জনগণকে রক্ষায় স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ছোট-বড় ম্যানুফ্যাকচারিং, আমদানি-রফতানি, ব্যবসা-বিপণন, কৃষি (খাদ্য, সবজি, মাছ, মাংস) উত্পাদন, পরিবহন, পর্যটন, সেবা ও আর্থিক খাতে পর্যায়ক্রমে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহত্ উদ্যোক্তাদের করোনায় ক্ষয়ক্ষতির শুমার করে প্রথমত তাদের টিকে থাকা এবং করোনার প্রকোপ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যার যার কাজ যেন জোরেশোরে শুরু করতে পারে সেজন্য প্রণোদনা প্যাকেজ আকারে নগদ সহায়তাসহ ট্যাক্স, ট্যারিফ, ফিসক্যাল, ইনসেনটিভ ঘোষণা করা। গ্রুপভিত্তিক সহায়তা বিতরণ ও ইনসেনটিভ প্রদানের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব পরিহার, পক্ষপাতহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টি ও জবাবদিহির ব্যবস্থাসংবলিত নীতিমালা ও অনুশাসন অনুসরণ আবশ্যক হবে।  নগদ সহায়তা প্রদান ও ইনসেনটিভ ঘোষণা বা প্রয়োগে বিলম্ব হলে উদ্দেশ্য সফল তো হবেই না, বরং অর্থনীতি বেশি করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

  1. আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বিধানসুশাসন কার্যকর  নীতিনৈতিকতার অধিষ্ঠান জোরদার করা

    বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের আর্থিক খাত করোনা পূর্বকাল থেকেই বেশকিছু বশংবদ দুর্বলতায় সংক্রমিত। ব্যাংকিং খাতে বড় বড় লোপাট, বিদেশে অর্থ পাচার, রাজস্ব ফাঁকি কিংবা অঢেল রেয়াত, কঠিন শর্তের দেশী-বিদেশী ঋণ গ্রহণ,  প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হেতু অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি, রেন্ট সিংকিং, ক্ষৈত্রিক পর্যায়েও পদে পদে দুর্নীতি, নানান ফন্দিফিকিরে গণসম্পদ ও স্বার্থ আত্মসাত্, ক্ষমতার অপব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিবিধান প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকার অবর্তমানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছিল। ফলে সমাজে আয়বৈষম্য বৃদ্ধির মাত্রা সীমা অতিক্রান্ত হচ্ছে। করোনা-উত্তর পরিবেশে আয়-ব্যয় বণ্টনবৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়টি সামাজিক সংহতি ও করোনায় ক্ষতি হেতু সবার বর্ধিত চাহিদা ও দাবি পূরণের পথে শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই করোনা-উত্তরকালে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। যেসব দেশে আয়-ব্যয়বৈষম্য পরিস্থিতি আগে থেকেই রোগাক্রান্ত, সেসব দেশে গণঅসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। বৈশ্বিক মন্দার প্রেক্ষাপটে নিজ নিজ দেশকেই তা মোকাবেলায় পারঙ্গম হতে হলে লুণ্ঠিত টাকা বা সম্পদ পুনরুদ্ধার ও বণ্টনে বৈষম্য-দুর্নীতি দমনের আবশ্যকতা দেখা দেবে। ফিসক্যাল মেজারমেন্ট ও ম্যানেজমেন্টে সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে।

    1. পণ্য  সেবা উত্পাদনআমদানিরফতানিসঞ্চয়  বিনিয়োগবাজার ব্যবস্থাপনায় ‘নিজেরটা নিজে দেখো’ নীতি অবলম্বন

    করোনার বিশ্বব্যাপী বিচরণে ও মোটাতাজাদের সরু হওয়ার কারণে জাতীয় ও বিশ্ব অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার চত্বর-চৌহদ্দিতে এ উপলব্ধি পরিব্যাপ্ত হচ্ছে বা হবে যে ‘পুঁজিবাদ’, ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’র ধ্যান-ধারণা হালে পানি পাবে না। এখন ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ নীতিতে অবগাহনের প্রয়োজন হবে। বঙ্গবন্ধু যেমনটি আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো।’ আমাদের কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থায় সাফল্য আছে। একে আরো জোরদার করতে হবে। জাপানের মাত্র ২০ শতাংশ জমি সমতল এবং মাত্র ১৩ শতাংশে তারা শুধু ধান চাষ করতে পারে। গবেষণা দ্বারা এমন চাষ পদ্ধতি তারা উদ্ভাবন করেছে যে খাদ্যশস্য উত্পাদনে দেশটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। মত্স্য, পশুসম্পদ উত্পাদনে বাংলাদেশ স্বয়ম্ভরতার পথে। যেহেতু বাংলাদেশের রয়েছে উর্বর কৃষিজমি, জলাশয়, অধিক ফলনশীল শস্য উত্পাদনের অবকাঠামো, উদ্যম ও উদ্যোগ, সেহেতু খাদ্যশস্য, সবজি, মত্স্য ও মাংস নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে বহির্বিশ্বের বর্ধিত ও সৃজিত চাহিদা মেটানোতে বাংলাদেশ বরং এ খাতে রফতানির মহাসড়কে উঠতে পারবে। করোনা এই সুযোগ বাংলাদেশের জন্য এনে দেবে যদি এ খাতের প্রতি যত্নবান ও মনোযোগ দেয়া হয়।

    বাংলাদেশের মানবসম্পদ তৈরি পোশাক খাতে যে অবদান রাখছে, তাতে ভ্যালু এডিশন আরো বাড়ানো সম্ভব হবে বাংলাদেশ যদি কাঁচামাল, মেশিনারিজ ও টেকনোলজিতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তুলতে পারে। যেকোনোভাবে হোক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তুলতে মনোযোগী হতে হবে। বাংলাদেশের মানবসম্পদকে বাধ্যতামূলকভাবে ভোকেশনাল ট্রেনিং দিয়ে, কারিগরি উচ্চশিক্ষায় মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করে দেশের চাহিদা (উল্লেখ্য, বিদেশী কর্মীদের দ্বারা বার্ষিক গড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন হয় বাংলাদেশ থেকে) মেটানো সম্ভব হবে। প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ দেশে যেকোনো বৃত্তিমূলক পেশায় এবং বিদেশে ‘ভালো বেতনে’ কাজ পাবেন। মানবসম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য করোনা-উত্তর বিশ্ববাজারে সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে এ আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়।

    করোনাকালে আমাদের বোধোদয় হচ্ছে সামনের দিনগুলোর নিয়ন্তা হবে ভার্চুয়াল যোগাযোগ সংস্কৃতি। ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মসূচিতে বাংলাদেশ সময়ের চেয়েও এগিয়ে আছে, এটি একটা বড় প্লাস পয়েন্ট। এ অবকাঠামোতেই বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তা উদ্ভাবক দেশে এবং বিদেশে ভার্চুয়াল অর্থনীতিতে সফলতার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবে। অতএব, মনোযোগ প্রয়োজন এখানেও।

    সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতে (বিশেষ করে ব্যক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প/কর্ম উদ্যোগে) বিনিয়োগের পাল্লা ভারী করতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ নীতিমালায় সংস্কার ও নতুন নতুন পথ-পন্থার সমাবেশ ঘটানোর প্রয়োজন হবে। বেসরকারি বিনিয়োগই কর্মসৃজন, ভোক্তা সৃষ্টি ও পোষণ, পণ্য ও সেবা উত্পাদনের হাতিয়ার। ব্যাংকঋণপ্রবাহ সরাসরি ক্ষুদ্র, মাঝারিদের কাছে বিনা মাশুলে যাওয়া-আসা করতে পারে; বেইলআউট-ইনসেনটিভ-প্রণোদনা সুযোগ-সুবিধা শুধু বড়রা বা মধ্যস্বত্বভোগীরা যেন হাতিয়ে না নিতে পারে আর আইনকানুনের খড়্গ শুধু প্রান্ত ও পান্থজনের বেলায় না হয়, সে বিধান বা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বা হওয়া লাগবে।

    অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের দায়িত্বটি সুচারু, ন্যায়-নীতিভিত্তিক, দুষ্টের যম, শিষ্টের বান্ধব হিসেবে পরিপালিত হলে রাজস্ব আহরণ যৌক্তিক মাত্রায় পৌঁছবে। যেসব খাত বা ক্ষেত্র থেকে মোটাদাগের কর/শুল্ক রাজস্ব আসবে, সেখানে অন্ধ আচরণ,  অর্জিতব্য রাজস্ব আয়কে ভিন্ন পদ্ধতির আড়ালে-আবডালে চ্যানেলাইজড হতে দিলে সরকারি সংস্থার দেয় রাজস্ব রাজস্ব বিভাগের পরিবর্তে কিংবা তাদের কাছে পাওনা সরকারের দায়দেনা সরাসরি পরিশোধের পরিবর্তে অন্যত্র রাখার বা দেয়ার ব্যবস্থা হলে রাজস্ব আয়ের হিসাব মিলবে না এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। করোনা-উত্তরকালে এসব যথা দেখভালের আওতায় আনার প্রয়োজন হবে।

    1. জাতীয় বাজেট বাস্তবায়ন  প্রাক্কলনজিডিপি প্রবৃদ্ধিমধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানোর প্রয়াসঅষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং এসডিজি বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিদ্যমান সময়সূচি  মানদণ্ড করোনার প্রভাব পর্যালোচনার আলোকে পুনর্নির্ধারণ

    করোনার অভিঘাত সঞ্চারিত হবে প্রধানত রফতানি খাত, প্রবাসী আয়, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক যোগাযোগ ব্যবস্থায়। নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবনমানের অবনতি হবে। রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে যথেষ্ট কম হবে। করোনা সংকটের কারণে সরকারের আয় কমবে, ব্যয় বাড়বে। গরিব-নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য সহায়তা বাড়াতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে করের হার কমাতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে মওকুফ করতে হবে। ফলে বাজেট ঘাটতি বেশ বাড়বে। সুদের হার ৬ ও ৯ শতাংশ বেঁধে দেয়ায় ব্যাংক আমানত কমলে বিনিয়োগও কমবে। সব দিক দিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। রফতানিমুখী শিল্প-কারখানার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনাসহ ৭২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। নিজস্ব ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এ অর্থ জোগান দেয়া কঠিন হবে। এজন্য আইএমএফ, বিশ্বব্য্যাংক থেকে মঞ্জুরি সহায়তা, সফট লোন বা সহজ ঋণের চেষ্টা চালাতে হবে। বিনিময়ে আর্থিক খাতে সুশাসন, বিনিয়োগ পরিবেশ, ব্যবসা সহজীকরণের শর্ত পূরণ করার জন্য এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়াতে হবে।

    করোনার কারণে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রেক্ষাপট প্রাসঙ্গিকতা পরিবর্তিত হওয়ায় পুনর্লিখন, পরিমার্জনের অবকাশ তৈরি হয়েছে বিধায় তার শুরুর সময় পেছানো প্রয়োজন হবে। ইত্যবসরে এক বা দুই বছর মেয়াদি বিশেষ (অর্থনীতি পুনরুদ্ধার) কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যাওয়া যেতে পারে। সংগত কারণে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়কাল বিলম্বিতকরণসহ এসডিজি অর্জনের সময়কাল বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার আলোকে ২০৩০ সাল থেকে কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে পারে।

    কর্তব্য দীর্ঘমেয়াদি

    ১.      বাংলাদেশ অর্থনীতির বহিমুর্খিনতাকে অন্তমুখীনকরণ, বৈদেশিক সাহায্য, বিদেশী বিনিয়োগ, বিদেশী কাঁচামাল, প্রযুক্তি ও পরামর্শ কমিয়ে দেশীয় লাগসই প্রযুক্তি, কাঁচামাল, সক্ষমতা, মানবসম্পদ ব্যবহারসহ নিজ বাজার সৃষ্টি তথা নিজের দিকে তাকানোর উপায় উদ্ভাবন।

    ২.      আন্তঃসহায়ক সলিলা শক্তিকে সম্মান, সমীহ ও অন্তর্ভুক্তি। জনগণই সম্মিলিতভাবে পরিশ্রম ও প্রয়াসের দ্বারা দেশের সব সাফল্য আনে। তাদের এই সক্ষমতা ও ভূমিকাই আন্তঃসহায়ক সলিলা শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যে চেতনা ও মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়, তাকে যথাস্বীকৃতি ও সম্মান দেয়া হলে, জনগণের পরিশ্রম, জনাকাঙ্ক্ষা, দাবিকে সমীহ করা হলে দেশ-জাতি তথা জনগণের উন্নয়ন অর্থবহ ও টেকসই হবে।

    ৩.      পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসকারী কার্যক্রম গ্রহণে আরো সতর্ক সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।

    ৪.      প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় লাগসই সক্ষমতা বৃদ্ধি। সংক্রামক-অসংক্রামক রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লে তা মোকাবেলার প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার মতো অবকাঠামো গড়ে তোলা, নীতিমালা নির্দিষ্ট করা।

    ৫.      জাতীয় ঐক্য ও সংহতিতে গুরুত্ব প্রদানকারী স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক অর্থনীতির বিকাশ।

    উপলব্ধির উপলব্ধি

    করোনার উত্স, অতি সংক্রমণের প্রসার, প্রতিরোধ এবং ব্যাপক প্রাণহানির প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে কোনো ঠাণ্ডা যুদ্ধ পরিস্থিতি আছে কিনা, মানবিক বিপর্যয় রোধে তাদের কারো কারো দৃশ্যমান ব্যর্থতার পেছনে ভিন্ন  উদ্দেশ্য বা অভিসন্ধি আছে কিনা, তা নিয়ে সমাজ ও রাজনীতি বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে সমালোচনা শুরু করে দিয়েছেন। মার্কিন ভাষাতত্ত্ববিদ-দার্শনিক নোয়াম চমস্কি সম্প্রতি সোজাসাপটা বলেই ফেলেছেন যে চীনের বাইরে দেশগুলোর কাছে করোনার ভয়াবহতার তথ্য আগে থেকে থাকা সত্ত্বেও Nothing was done. The crisis was then made worse by the treachery of the political systems that didn’t pay attention to the information that they were aware of.’ রাজনৈতিক ভেদবুদ্ধির ফেরে কিছুই করা হয়নি, নইলে করোনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেত। যাহোক, এটি এখন বাস্তবতা যে নভেল করোনাভাইরাস বিশ্বের এখন পর্যন্ত ২০৫ দেশের মানুষকে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্ক-আশঙ্কায় ফেলেছে, যা অতীতে কখনো এমন কোনো দৈবদুর্বিপাক, মহামারী বা দুর্যোগ এভাবে মানুষকে ভয়ের কাতারে বাঁধতে পারেনি। মানুষের মাধ্যমে ভয়ানক প্রকৃতির এ ভাইরাস সংক্রমিত হয় বলে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির এবং সামাজিক সংযোগ শুধু নিষিদ্ধই হচ্ছে না, করোনায় আক্রান্তের প্রতি সহানুভূতি ও চিকিত্সাসেবা দেয়ার ব্যাপারটিও স্পর্শকাতরতার কাদায় মাখামাখি হয়ে মানবতার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন, করোনার ভয় সবাইকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ব্যক্তি স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য করোনা যেমন ভয়াল প্রতিপক্ষ, মানুষের জীবন-জীবিকা, তার আর্থসামাজিক অবস্থান, দেশ ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য করোনা ব্যাপক  অঘটনঘটনপটিয়সী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। পুঁজিবাদ, বিশ্বায়ন, মুক্ত বাজার অর্থনীতির ধারণা এবং এমনকি মেকি গণতন্ত্র অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে বলে পণ্ডিতরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। ইতিহাসের সাক্ষ্য এই—বিধাতাপ্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদ উপভোগে অপব্যবহারের উদগ্র বাসনায়, উদ্ধত আচরণে অমানবিক, অন্যায় অবিচারের দ্বারা, অকৃতজ্ঞতায় সত্য ও সুন্দরের প্রতি বিরূপ আচরণে অতিষ্ঠ হয়েছে প্রকৃতি। বহু বছর পরপর সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে মহামারী আসে উচিত শিক্ষা দিতে। বিশ্ববাসীর উপলব্ধিতে করোনা তাই প্রকৃতির প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে এসেছে। সে সূত্রেই করোনা মোকাবেলায় আত্মশুদ্ধির চেতনা জাগ্রত হচ্ছে। অনুতাপ, অনুশোচনায় সৃষ্টিকর্তার কাছে মার্জনা ও পরিত্রাণ প্রার্থনায় নিত্য নত হচ্ছে মানুষ। উপলব্ধির উপলব্ধিতে আসছে—

    Corona, the pandemic seems to have arrived to shake up the world to remove all the dust of inhumanity, inequality, lust, greed, falsehood,and pride that has engulfed the world with evil acts over a period of time…Let’s reflect, repent and learn…Let’s wash our SOULS, not only hands!

    [মহামারী করোনা যেন যুগ যুগ ধরে মানবতার অবমাননা, বৈষম্য, লোভ-লালসা, মিথ্যাবাদিতা ও অহমিকার যে পাপাচার বিশ্বকে গ্রাস করছিল, তার সমুদয় দূর করতে গোটা বিশ্বে একটা প্রবল ঝাঁকুনি দিতেই এসেছে। আসুন আমরা আত্মশুদ্ধি ও অনুশোচনার শিক্ষা নিই।

    আসুন আমরা শুধু দুহাতকে নয়, আমাদের বিবেককে বারবার ধৌত করি।

     

    মোহাম্মদ আবদুল মজিদসাবেক সচিব

    এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান