জুমার দিনে যে আমলগুলো বদলে দেয় জীবন জুমার দিনে মুমিনের করণীয়

মুফতি সাইফুল ইসলাম
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬ । ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ

জুমার দিনে যে আমলগুলো বদলে দেয় জীবন
জুমার দিন ইসলামে এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিন। এটি সাপ্তাহিক ঈদের দিন, যেদিন মুসলমানরা সম্মিলিতভাবে ইবাদত করে, আল্লাহর রহমত লাভের সুযোগ পায় এবং নিজেদের আত্মিক উন্নতির জন্য বিশেষ আমল করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনের জন্য কিছু সুন্নত ও আদব নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যা অনুসরণ করলে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ হয়।

জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো গোসল করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,

إِذَا جَاءَ أَحَدُكُمْ الْجُمُعَةَ فَلْيَغْتَسِلْ

‘তোমাদের মধ্যে কেউ জুমার সালাতে আসলে সে যেন গোসল করে।’ (বুখারী, হাদিস: ৮৭৭;)

গোসলের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করাও সুন্নত। নখ কাটা, চুল পরিপাটি করা ইত্যাদি এই দিনের প্রস্তুতির অংশ। হাদীসে এসেছে,

“‏ غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ وَسِوَاكٌ وَيَمَسُّ مِنَ الطِّيبِ مَا قَدَرَ عَلَيْه‏ “‏.

‘প্রত্যেক বালেগ ব্যক্তির ওপর জুমার দিনে গোসল করা, মিসওয়াক করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সুগন্ধি ব্যবহার করা আবশ্যক।’ (মুসলিম, হাদিস: ৮৪৬)

সুগন্ধি ব্যবহার করা জুমার দিনের একটি সুন্দর আমল। এটি শুধু ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অংশ নয়, বরং অন্য মুসল্লিদের জন্যও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করে।

এ দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো উত্তম পোশাক পরিধান করা। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তোমরা প্রত্যেক সালাতের সময় তোমাদের সুন্দর পোশাক গ্রহণ কর।’
(সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত : ৩১) মুফাসসিরগণ বলেন, এই আয়াতের একটি প্রয়োগ হলো জুমা ও ঈদের দিনে সুন্দর পোশাক পরিধান করা।

জুমার দিনের বিশেষ আমলের মধ্যে সূরা আল-কাহফ তিলাওয়াত অন্যতম। রাসুল (সা.) বলেছেন,
‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় আলোকিত হয়ে থাকবে।’ (আল-কুবরা (বাইহাকী), হাদিস: ৫৮৫৬; সহীহুল জামে‘, হাদিস: ৬৪৭০)

মসজিদে তাড়াতাড়ি যাওয়া জুমার দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। মহানবী (সা.) বলেছেন,
‘যে ব্যক্তি জুমার দিন প্রথম সময়ে মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট কুরবানি করল, এরপর ক্রমান্বয়ে গরু, ছাগল, মুরগি ও ডিম দান করার সমান সওয়াব পায়।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৮৮১; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫০)

মসজিদে গিয়ে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। রাসুল (সা.) বলেছেন,

إِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَنْصِتْ وَالْإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ.

‘জুমার দিন যখন তোমার পাশের মুসল্লিকে চুপ থাকতে বলবে, অথচ ইমাম খুৎবাহ দিচ্ছেন, তা হলে তুমি একটি অনর্থক কথা বললে।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৯৩৪)

খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা শুধু আদব নয়, বরং তা জুমার নামাজের পূর্ণ সওয়াব লাভের শর্তগুলোর একটি।

এ ছাড়া জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ শরীফ পড়ারও বিশেষ ফজিলত রয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জুমার দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো, কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)

জুমার দিনের একটি বিশেষ মুহূর্ত আছে, যখন দোয়া কবুল হয়। আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সা.) জুমার দিন সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং বলেন, এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যে কোন মুসলিম বান্দা যদি এ সময় সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর নিকট কিছু প্রার্থনা করে, তবে তিনি তাকে অবশ্যই তা দিয়ে থাকেন এবং তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত। (বুখারী, হাদিস: ৯৩৫)

এই সময়টি অধিকাংশ আলেমের মতে আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত হতে পারে, তাই এই সময় দোয়া করা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

মিসওয়াক করা জুমার দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এটি মুখকে পবিত্র করে এবং ইবাদতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মিসওয়াক মুখকে পবিত্র করে এবং রবকে সন্তুষ্ট করে।’ (সুনান নাসাঈ, হাদিস: ৫; সহীহুল জামে, হাদিস: ৩৬৯৫)

জুমার দিনের এই সুন্নাতগুলো শুধু কিছু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এগুলো মানুষের ব্যক্তিত্ব, পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং আত্মিক উন্নয়নকে একত্রে গড়ে তোলে। যে ব্যক্তি এগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করে, সে শুধু একটি দিনের ইবাদতই সম্পন্ন করে না, বরং তার পুরো জীবনধারাকে সুন্দর ও পরিপূর্ণ করে তোলে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

সম্পাদক: আলহাজ্ব আকবর কবীর, মোবা: +৮৮০১৭১২-৩৩৩৬২৩, +৮৮০১৭১১-৩৮১২৯০, বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯৭২-৩৩৩৬২৩, ঠিকানা: ঢাকা, বাংলাদেশ। ই-মেইল: akborkabir9@gmail.com

প্রিন্ট করুন