মিত্রদের পতনে পুতিন কখনো সরব, কখনো নিশ্চুপ গাদ্দাফি থেকে খামেনি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহতের পরদিন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একে ‘মানবিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের নির্লজ্জ লঙ্ঘন’ এবং একটি ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেন। তবে এ ঘটনার জন্য কারা দায়ী, তাদের নাম উল্লেখ করা থেকে তিনি পুরোপুরি বিরত ছিলেন। এমনকি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে পাঠানো শোকবার্তায়ও তিনি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করেননি। অথচ ২০১১ সালে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি বা ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের পতনের সময় পুতিনের কণ্ঠ ছিল তীব্র ও সরাসরি আক্রমণাত্মক। গত দেড় দশকে মস্কোর অন্তত পাঁচটি মিত্র দেশের সরকারের পতন ও শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে ক্রেমলিনের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পুতিন কখনো সরব, আবার কখনো রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ।
২০১১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মিত্রদের পতনে পুতিনের দেওয়া বিবৃতির ধরনে এ পরিবর্তন স্পষ্ট। বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একের পর এক পতন হচ্ছে, যা তার জন্য বেদনাদায়ক; অন্যদিকে তিনি প্রকাশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আগের মতো আক্রমণ করতে পারছেন না। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার আশা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া এক ধরনের ‘ক্রমবর্ধমান ভীতি’ তাকে সতর্ক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি থাকলেও মস্কো সেখানে সামরিক সহায়তা দিতে বাধ্য নয়, এমন আইনি মারপ্যাঁচ এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে পুতিনের এই ‘সতর্ক’ প্রতিক্রিয়া মূলত তার সমর-পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। এক সময়ের সোচ্চার পুতিন এখন মিত্রদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলেও দায়ীদের নাম নিতে দ্বিধাগ্রস্ত, যা তার রাজনৈতিক অবস্থানের এক নতুন বিবর্তনকে নির্দেশ করে।
গাদ্দাফি ও ইয়ানুকোভিচের পতনে পুতিন ছিলেন আক্রমণাত্মক: ২০১১ সালের অক্টোবরে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিহত হওয়ার পর ভ্লাদিমির পুতিন অত্যন্ত বিস্তারিত ও কঠোর বিবৃতি দিয়েছিলেন। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন যে, ‘আমেরিকার ড্রোন’ গাদ্দাফির গাড়ি বহরকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তিনি সেই সময় বিদেশি স্পেশাল ফোর্সের উপস্থিতির সমালোচনা করে এই হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচারহীন নির্মূল’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এমনকি জাতিসংঘের প্রস্তাবকে তিনি ‘ক্রুসেডের জন্য মধ্যযুগীয় আহ্বান’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন।
একইভাবে ২০১৪ সালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুত হলে পুতিন সরাসরি পোল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নাম ধরে সমালোচনা করেন। তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, তিনি নিজে ইয়ানুকোভিচকে ক্রিমিয়ায় পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিলেন। সে সময় তিনি ইউক্রেনের ক্ষমতা পরিবর্তনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘটানো ‘অভ্যুত্থান’ এবং রাশিয়ার সঙ্গে ‘বর্বর প্রতারণা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
আসাদ ও মাদুরোর পতনে নীরবতা: তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুতিনের এই সরাসরি আক্রমণাত্মক ভঙ্গি স্তিমিত হতে শুরু করে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটলে রাশিয়া তাকে মস্কোতে আশ্রয় দেয় ঠিকই, কিন্তু পুতিন এ ঘটনার কোনো নিন্দা জানাননি বা দায়ীদের নাম নেননি। আসাদ মস্কোয় আসার দুই সপ্তাহ পরও পুতিন দাবি করেন, সিরিয়ার ঘটনায় রাশিয়া ব্যর্থ হয়নি। দীর্ঘ ১৩ মাস পর তিনি সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানান।
সবচেয়ে বিস্ময়কর নীরবতা দেখা যায় ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যখন মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে আমেরিকায় নিয়ে যায়, তখন পুতিন প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্যই করেননি।
খামেনি হত্যাকাণ্ড ও বর্তমান সংকট: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় পুতিন বিবৃতি দিলেও এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কৌশলী। তিনি খামেনিকে হত্যার ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করলেও কারা এই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে, তাদের নাম উল্লেখ করেননি। এমনকি ২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বিমান হামলার সময়ও তিনি ওই ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি অভিযুক্ত করেননি।

আপনার মতামত লিখুন